শনিবার, ৩০ মে, ২০১৫

বার বার হেরে যাবার গল্প

Collected From- https://www.facebook.com/tahsinmashroofhossain/posts/830821353620253

দুহাজার তিন সালে সায়েন্স গ্রুপ থেকে আমি এইচ এস সি পাস করি, 3.60 আউট অফ 5 এর ভয়াবহ সিজিপিএ নিয়ে| ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলাম, আন্ত: ক্যাডেট কলেজ প্রতিযোগিতাগুলোর কারণে প্রায় সবাই চিনত| ক্যাডেট কলেজের শেষ এক বছর এক্সট্রা কারিকুলামই শুধু করেছি, কারিকুলামটা আর করা হয়ে ওঠেনি| সায়েন্স বিভীষিকার মত লাগত, বিশেষ করে কেমিস্ট্রি| আমার বড় চাচা কেমিস্ট্রি গোল্ড মেডালিস্ট শিক্ষক, কেমিস্ট্রিকে বাবা বলতেন "পারিবারিক সাবজেক্ট"| সেই কেমিস্ট্রিতে পেলাম বি মাইনাস, ম্যাথে সম্ভবত সি|
এইচ এস সি পরীক্ষার রেজাল্টের পরের দু মাস ছিল রীতিমত নরকসম| সফল কোন আত্মীয়/বন্ধুর মা ফোন করতেন আমার মা কে, দূর থেকে অপরাধীর মত শুনতাম আম্মুর কণ্ঠ- "না ভাবী, আমার ছেলে ভাল করেনাই, পাস করেছে কোনরকম"| টপ টপ করে চোখ বেয়ে পানি পড়ত, আমারও, আম্মুরও- কিন্তু যন্ত্রণার সেটা কেবল শুরু|
ইংরেজিতে কিছুটা ভাল ছিলাম, প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করলাম আইবিএ এর জন্যে| দিনে বারো থেকে আঠের ঘন্টা পড়াশোনা, ফলাফল হল অশ্বডিম্ব- লিখিত পরীক্ষাতেই টিকলাম না| আইবিএ রেজাল্টের পর মোটামুটি গৃহবন্দীতে পরিণত হলাম- আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে সারাজীবন যাকে তৃতীয় শ্রেনীর গর্ধব বলে জেনেছি, তিনিও আব্বু আম্মুকে ফোন করে জ্ঞান দেয়া শুরু করলেন- আপনার ছেলের কি হবে এখন?
আমাদের সমাজটা কেন জানি ব্যর্থদের প্রতি প্রচন্ড নির্মম| জীবনের কোন একটা লড়াইয়ে আপনি হেরেছেন কি মরেছেন, হায়েনার দল ওত পেতে বসে আছে আপনার দগদগে ঘা তে মরিচগুঁড়ো সহকারে লবন দেবার জন্যে|কেউ একটিবারের জন্যে আপনার ক্ষতবিক্ষত বুকে হাত বুলিয়ে বলবেনা, " ধুর বোকা, ভেঙে পড়ার কি আছে, এ লড়াই তো শেষ লড়াই না!"
আঁধারের মাঝে আলোকচ্ছটা হয়ে এল আমার আইএসএসবি তে টেকা, তাও সেটা মাত্র কয়েক মাসের জন্যে| বিএমএ যাবার তিন মাসের মধ্যে বুঝতে পারলাম, প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ম মেনে চলা কঠোর এ সেনাজীবনের উপযুক্ত আমি নই| স্বেচ্ছায় চাকুরি ছেড়ে চলে আসার দিন প্লাটুন কমান্ডার মেজর এম বলেছিলেন- You are just a goddamn failure.You have failed here, I can write down in the stamp paper that you will never succeed anywhere in your life.
আর্মিতে যাবার আগে শেষবারের মত জীবনের "রঙ" দেখতে নর্থ সাউথে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, ওটাই শেষে ঠিকানা হল| প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ি শুনে আত্মীয় স্বজনদের মধুর মন্তব্য- "বাপের টাকা আছে দেখে করে খাচ্ছে, নাহইলে তো রাস্তায় ইঁট ভাঙারও যোগ্যতা ছিলনা| জানি তো, আর্মি থেকে লাত্থি মেরে বের করে দিয়েছে!"
নর্থ সাউথের পারফরম্যান্সও তথৈবচ, প্রথম দু সেমিস্টারে ছটা সাবজেক্টের পাঁচটায় ফেইল, আরেকটায় সি মাইনাস| এরপর জোর করে কিছুটা পড়াশোনা করে পাস করলাম সাড়ে তিনের কাছাকাছি সিজিপিএ নিয়ে, আমার ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় যেটা আহামরি কিছুই না| অর্থনীতির ছাত্র,কিন্তু ইংরেজিতে কিছুটা দখল থাকায় চাকুরি হল ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে, টিচিং এ্যাসিস্টেন্টের কাজ|
আমার বন্ধুরা একে একে বাইরে পড়তে গিয়েছে , কিন্তু আমার সে যোগ্যতা ছিল না| ঠিক করলাম বিসিএস দেব, বাবার মত সরকারী চাকুরি করব|
"এনেসিউ তে পড়ে বিসিএস? বাবা, ওসব জায়গায় টেকা প্রাইভেটের ছেলেপেলের কম্মো না, যাও বাপের বিজনেসে বসো গিয়ে, নইলে মামা চাচা ধরে দেখ কোন কোম্পানিতে ঢুকতে পারো কিনা| মাল্টিন্যাশনালে ঢোকা তোমার যোগ্যতায় কুলাবে না, দেখলাম তো"
প্রিয় পাঠক, আজকে আপনারা আদর করে আমাকে সুপার কপ ডাকেন| মাত্র পাঁচ বছর আগেই আমাকে প্রতিনিয়ত উপরের কথাগুলো শুনতে হয়েছে|
বিসিএস পরীক্ষার রেজাল্ট হল, ফরেন সার্ভিস পেলাম না| রেজাল্ট খারাপ হয়নি, পুলিশ ক্যাডারের মেধাক্রমে চতুর্থ হয়েছিলাম| তবু জেনে গেলাম, ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট হিসেবে কোনদিনও আমি জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে লাল সবুজ পতাকার প্রতিনিধিত্ব করতে পারছিনা| বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা পরম মমতায় লালিত স্বপ্নের কি করুণ অপমৃত্যু!
পুলিশ একাডেমিতে যাবার আড়াই মাসের মাথায় হঠাৎ একদিন দুবছর ধরে স্বপ্ন দেখানো মেয়েটি জানালো, পুলিশের চাকুরি করা কারো সাথে বাকি জীবন কাটানো তার পক্ষে সম্ভব না, শি ইজ ডেটিং সামওয়ান এলস!
প্রথম প্রেম ছিল ওটা, ওকে ছাড়া কাউকে কল্পনাও করতে পারতাম না| উফ, কি কষ্ট, কি ভয়াবহ কষ্ট! মনে হত শত শত বিষাক্ত কেঁচো আমার ভেতরের সবটুকু প্রাণ শুষে নিয়েছে!
দুবছর যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, পুরো স্বপ্নটুকু নিষ্ঠুরের মত ছিঁড়ে ফেলার যন্ত্রণা কেবল আমিই জানি| আমার ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ছিল ওর নামে| হাউমাউ করে দরজা আটকে কি কান্নাটাই না কেঁদেছিলাম ওটা বদলানোর সময়!
মজার ব্যাপার, হৃদয়ঘটিত কষ্টের ঘটনাক্রমে এ ঘটনাটির স্থান প্রথম নয় আমার জীবনে| প্রথমটির গল্প অন্য কোন দিন, যেদিন আমি আরেকটু শক্ত হব তখন|
পুলিশ একাডেমি থেকে পাস আউট করার পর সিলেক্টেড হলাম মাননীয় প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর দেহরক্ষী বাহিনী স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সে| সেখানেও যোগ দেয়া হলনা, পুলিশ বিভাগে আমার আইডল বেনজীর স্যার আমাকে নিয়ে এলেন ডিএমপি হেডকোয়ার্টারে| সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর গেলাম উত্তরায়, এসি (প্যাট্রোল ) হিসেবে| ফেসবুকের পোকা ছিলাম তখনো, পিএটিসিতে ফাউন্ডেশন ট্রেনিং-এ শেখা "কাইজেন" (KAIZEN) পদক্ষেপ হিসেবে উত্তরাবাসীকে পুলিশি সহায়তা দিতে খুলে ফেললাম ছোট একটা ফেসবুক পেজ|
বাকি গল্পটা আমার পরিচিত অনেকেই জানেন, পুনরাবৃত্তি করে আর বিরক্তি উৎপাদন করছিনা|
এবার মজার কিছু তথ্য দেই:
1) প্লাটুন কমান্ডার ভদ্রলোকের সাথে আরেক জায়গায় দেখা হয়েছিল| বেনজীর স্যারের সাথে গাড়ি থেকে আমাকে নামতে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠেছিলেন তিনি, আমি মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়েছিলাম মাত্র|
2) গত বছর আইবিএ তাদের অভিজাত Brandedge ম্যাগাজিনে আমার একটা সাক্ষাতকার ছাপিয়েছিল| ম্যাগাজিনটা হাতে পেয়ে কেন জানি আনন্দিত হইনি, আইবিএ রেজাল্টে বাদ পড়া রক্তহীন মুখে দাঁড়ানো সেই কিশোরটার মুখ বড্ড চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছিল| ম্যাগাজিনে ছাপানো নিজের ছবিটা দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না
3) জাপানের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল Tokyo Institute of Technology এর গেইটে পা রেখে প্রথম যে কথাটি মাথায় এসেছিল তা হচ্ছে, বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেবার মত সিজিপিএ আমি এইচ এস সি তে পাইনি|
আমি এমন এক বাবা, যে তার দুমাসের অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি| কষ্টটা ভুলে থাকি কিভাবে জানেন?
এই আপনাদের নিয়ে|
সবশেষে এই বার বার হেরে যাওয়ার গল্পের ইতি টানছি আমার খুব প্রিয় তিনটি উক্তি দিয়ে:
প্রথমটা "ব্যাটম্যান বিগিন্স" থেকে:
:Why do we fall, Bruce?
:So that we learn to pull ourselves up.
দ্বিতীয়টি দ্য আলকেমিস্ট এর লেখক পাউলো কোয়েলহোর:
"The meaning of life is to fall seven times and get up at eighth"
আর সর্বশেষটা টম হ্যাংক্স অভিনীত মুভি "কাস্ট এ্যাওয়ে" এর:
"I know what I have to do now. I gotta keep breathing. Because tomorrow the sun will rise. Who knows what the tide could bring?"
আমার মত হারু পার্টির স্থায়ী সদস্য যদি হাল না ছেড়ে লড়ে যেতে পারে, আপনি পারবেন না?!
এইটা কোন কথা?!?
সবাইকে শুভেচ্ছা!

সোমবার, ২৫ মে, ২০১৫

জীবন যেরকম

(আমার ফ্রেন্ড/ ফলোয়ার/ ফ্যানদের অনুরোধে আমার ৪টা স্ট্যাটাসকে নোট আকারে রেখে দিলাম।)- Sushanta Paul

https://soundcloud.com/abu-salman-mohammad-abdullah/rj-salman-reading-shushanta-pauls-status-listen-it-and-inspire-yourself
৫ মে

: দোস্তো, তুই আমার কথাটা শোন, আমি কলেজছুটির পর তোকে লিফট দেবো, তোর বাসায় আমার গাড়িতে করে নামিয়ে দিয়ে আসব।
: ধুরর্ ব্যাটা! রাখ তোর লিফট! তোর বাপের গাড়িতে তো আমি উঠবই না, নামাবি কীভাবে?


আমার ছোট্ট ফ্রেন্ড / ফ্যান / ফলোয়াররা, This is the attitude! তোমার বন্ধুর বাবার টাকায় শুধু ওকে চলতে দাও, তুমি চলো না। জীবনে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হলে অল্প বয়সেই মাথা নিচু না করে চলাটা শিখতে হয়। প্রয়োজনে না খেয়ে থাকবে, তবুও কারোর বাবার পয়সায় কখনোই একটা বার্গারও খাবে না যদি ওকেও আরেকদিন একটা বার্গার খাওয়ানোর ক্ষমতা কিংবা সুযোগ তোমার না থাকে। দাদার নামে গাধা, বাপের নামে আধা, নিজের নামে শাহজাদা। আর পরের বাপের নামে তো মহাগাধা! জীবনে যা-ই কর না কেন, পেছনে হাত দিয়ে দেখে নাও মেরুদণ্ডটা ঠিক জায়গাতে আছে তো? রেস্টুরেন্টে বসার আগেই দেখে নাও পকেটে বিল দেয়ার পয়সা আছে কিনা। যে তোমার বিল দেয়, চকোলেট কিনে দেয়, গাড়িতে লিফট দেয়, শপিং করে দেয়, মোবাইল ফোনটা ব্যবহার করতে দেয়, সে কিন্তু তোমাকে আস্তে আস্তে কিনে নেয়। একবার আত্মসম্মানবোধ বিকিয়ে দেয়ার বদ অভ্যাস করে ফেললে জীবনেও আর কোনদিন বড় হতে পারবে না। বাজি ধরে বলতে পারি, ইচ্ছেটাও নষ্ট হয়ে যাবে। জীবনে শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেও না। শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও হলেও চেষ্টা করে যাবে। মাথা নত করে বাঁচার চাইতে মৃত্যুবরণও শ্রেয়। প্রাণ থাকতে কখনোই কারোর কাছে মাথা নত করবে না, কারোর পা চেটে চলবে না, সে ব্যক্তি যে মহারাজাই হোন না কেন! এ অভ্যাসটা করতে হবে অল্পবয়সে। নিজের বাবাকে আরেকজনের বাবার কাছে প্রাণ গেলেও ছোট হতে দিয়ো না। একদিন তোমার বাবা আর তোমাকে চালাতে পারবেন না। সেদিন তোমাকে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। পেছনের মেরুদণ্ডটা না থাকলে দাঁড়াবে কীভাবে?

৬ মে

গতকাল অফিস আর সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে সন্ধ্যায় অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হল। বিয়ানীবাজারের এক ভদ্রলোক আবদুল আলীম লোদী। (উনি ইব্রাহীম লোদীর কেউ হন নাকি?) গাছ ভালবেসে ভেষজ আর ফলজ উদ্ভিদের বাগান গড়ে তুলেছেন। উনার প্রচণ্ড ইচ্ছে, এ লোদী গার্ডেনের কথা দেশময় ছড়িয়ে যাক। সবাইকে খুব আগ্রহ নিয়ে ঘুরে ঘুরে বাগান দেখান। কালকে সন্ধ্যায় অসম্ভব টায়ার্ড ছিলাম। শুধু কাউকেই 'না' বলতে পারি না বলে উনার অনুরোধ আর আগ্রহে রাত সাড়ে ৮টার দিকে লোদী গার্ডেনে গেলাম। দেশিবিদেশি অনেক দুষ্প্রাপ্য গাছে বাগান ভর্তি। উনি টর্চলাইট জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে গাছ চেনাচ্ছিলেন। গাছ আমি নিজেও ভালবাসি, গাছের প্রতি একধরণের মমত্ব অনুভব করি। কিন্তু প্রচণ্ড শারীরিক অবসাদের কারণে অতিবিরক্ত লাগছিল। তবুও কষ্ট করে হাসিমুখে উনার কথা মন দিয়ে শোনার অভিনয় করে যাচ্ছিলাম। এমনই ঘর্মাক্ত হাসিমুখ, উনার অনুরোধে যে কয়েকটি ছবি তুলেছি তার প্রত্যেকটাতে আমাকে দেখাচ্ছে পকেটমারের মতো, দেখলেই যে কারোরই ধরে গণধোলাই দিতে ইচ্ছে করবে। গাছ নিয়ে উনার প্রচণ্ড আবেগ আর ভালবাসা সত্যিই দেখার মতো। এ পৃথিবীতে শুধু আবেগ আর ভালবাসা দিয়ে মাস্টারপিস বানানো সম্ভব। সাথে প্রয়োজন অক্লান্ত পরিশ্রম করার মানসিকতা। এর সবই লোদী সাহেবের আছে। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। কালকে এটা আরো একবার শিখলাম।


রেস্টহাউজে ফিরলাম রাত সাড়ে ১০টার দিকে। শরীর যেন ভেঙে পড়তে চাইছে। পরদিন, মানে আজকে সকাল ৭টায় আবার ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান আছে। এদিকে প্রথম আলো'তে শুক্রবারের চাকরিবাকরি পাতায় বিসিএস লিখিত পরীক্ষার বাংলাদেশ বিষয়াবলীর প্রস্তুতিকৌশল নিয়ে লেখাটা রেডি করে বুধবার বিকেলের মধ্যেই পাঠাতে হবে। মানে, লেখাটা যে করেই হোক, রেডি করতে হবে আজকে রাতের মধ্যেই। কিন্তু এ শরীর নিয়ে সেটি কিছুতেই সম্ভব নয়। গোসলটোসল সেরে সাড়ে ১১টার দিকে প্রথম আলো'তে ফোন দিলাম। 'অনিবার্য কারণবশত আজকের লেখাটি ছাপানো সম্ভব হল না। লেখাটি আগামী সংখ্যায় ছাপানো হবে।' আমার পক্ষে এ ক্লান্ত শরীর নিয়ে লেখাটা খুব কঠিন হবে, তাই এরকম কিছু একটা ছেপে দিতে বললাম। কিন্তু উনি জানালেন, এ মুহূর্তে এটা করা কিছুতেই সম্ভব নয়। সবাই লেখাটির জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। একটু কষ্ট হলেও যেন দয়া করে লিখে দিই। . . . . . . সত্যিই অসহায় লাগছিল। যেমনতেমন করে তো আর লেখাও যায় না, এত লোক পড়বে! তার উপর এ ধরণের লেখা লেখার সময় আমার ভেতরে একটা প্রচণ্ড দায়িত্ববোধ কাজ করে। শওকত ওসমানের জননী পড়ছিলাম। ওটা আরো একটু পড়েটড়ে সাড়ে বারটার দিকে লিখতে বসলাম। এ বসা প্রয়োজন থেকে নয়, আবেগ থেকে, ভালবাসা থেকে, অসীম দায়িত্ববোধ থেকে। জানি বেশিক্ষণ ঘুমুতে পারব না, কালকে মোটামুটি ভোর থেকেই সারাদিন ঘোরাঘুরি করতে হবে, তবুও। ল্যাপটপে স্লো ইনস্ট্রুমেন্টাল ছেড়ে লিখতে লাগলাম। ফেসবুকিং করেটরে লেখাটা শেষ করে যখন শুতে গেলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন আড়াইটা ছুঁইছুঁই। ঘুমুতে যাওয়ার আগে মনে মনে শপথ করলাম, পরের জন্য আর না, এখন থেকে একটু নিজের জন্য বাঁচব। দুচ্ছাই! বলে সব ছেড়েছুঁড়ে দেবো! কী হবে এসব করে? সবাই তো আর ভালবাসে না, কেউ কেউ তো গালাগালিও দেয়। কী দরকার! যথেষ্ট হয়েছে! . . . . . . . নিজের উপর রাগটা একটা ভোর হওয়া পর্যন্তই! জানি, মানুষের অপরিসীম ভালবাসায় এই ভূতের বেগার খাটা কখনোই বন্ধ করে দিতে পারব না। হয়তো থমকে যাবো কখনো কখনো, তবুও থামব না। সবচাইতে বেশি কষ্ট পাই, যখন দেখি আমার কাজগুলো নিয়ে কেউ আজেবাজে মন্তব্য করছে। শারীরিক কষ্টও এতটা কষ্ট দেয় না। এসব লেখালেখি, ক্যারিয়ার আড্ডা, মোটিভেশনাল কাউন্সেলিং থেকে এ পর্যন্ত এক পয়সাও তো কোনদিনও নিইনি!


তিন ঘণ্টার মতো ঘুমিয়েছি। ৭টায় ঘুরতে বের হলাম। এখন আছি বিছানাকান্দি আর পাংথুমাইয়ের পথে। এরপর রাতারগুল, জৈয়িন্তাপুরের সাইট্রাসবাগান, রাজবাড়ি, লালাখাল। বিছানাকান্দি যাওয়ার রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিল-হাওড়ের দূশ্যটা দেখার মতো। রাস্তার ধারে সারি সারি জেন্টলম্যান-দেখতে গাছগুলো, এরই মাঝ দিয়ে ছুটে চলা। বস্তুত জীবন তো ছুটে চলাই! হোক সুন্দরের মধ্য দিয়ে কিংবা অসুন্দরের মধ্য দিয়ে। জীবন শুধু সুন্দরই নয়, জীবন অসুন্দরও। আমার প্রিয় কবি রবার্ট ফ্রস্টকে মনে পড়ছেঃ জীবন সম্পর্কে আমি যা শিখেছি, সেটিকে আমি তিনটি শব্দে বলে দিতে পারি--- জীবন বয়ে চলে। দ্য শশ্যাঙ্ক রিডেম্পশনের অ্যান্ডি ডুফ্রেইনের কথাটি মাথায় রেখেও জীবনটা দিব্যি কাটিয়ে দেয়া যায়ঃ Get busy living, or get busy dying.

৭ মে

কালকের প্রথম আলো'তে বিসিএস লিখিত পরীক্ষার বাংলাদেশ বিষয়াবলীর প্রস্তুতিকৌশল নিয়ে আমার একটা লেখা থাকছে। গতসপ্তাহের লেখাটা ছিল আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর উপর। লিখিত পরীক্ষার সব বিষয় নিয়েই লেখা হয়ে গেল। এসব টেকনিকের বাইরে আরোকিছু মাথায় আসলে আমার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করে দেবো। যাদের কাছে লেখাগুলো সংগ্রহে নেই, তারা আমার ওয়াল থেকে পুরোনো পোস্টেই পেয়ে যাবেন। কিছুদিন পর প্রথম আলো’তে সামগ্রিক প্রস্তুতিকৌশল আর এক্জামফিটনেস নিয়ে কিছু কথা লিখব।


এই আমিও বাংলাদেশ বিষয়াবলী আর আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছি! ব্যাপারটা আমার কাছে এখনো অবিশ্বাস্য লাগছে! কেন? বলছি।


আমার পেপারটেপার পড়ার অভ্যেস নেই। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করার আগে বিনোদন পাতা আর সাহিত্য পাতা ছাড়া পেপারের আর কোনো অংশ তেমন একটা পড়তাম না। বাসায় পেপার রাখত ২টা। এর একটাও আমি পড়তাম না। বিসিএস'য়ের প্রস্তুতির জন্য নিতান্ত বাধ্য হয়ে অনলাইনে প্রতিদিন ৫-৬টা পেপার পড়তে শুরু করি এবং চাকরিটা পেয়ে যাওয়ার পর আবারও পেপারপড়া ছেড়ে দিই। দেশের এবং বিশ্বের কোথায় কী হচ্ছে, রাজনীতির হাওয়া কোনদিকে, ব্যবসাবাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি, এসব ব্যাপার নিয়ে আমার কোনকালেই কোন মাথাব্যথা ছিল না, আমি এর কিছুই জানতাম না, বুঝতাম না, এবং এ নিয়ে আমার কোন দুঃখবোধও ছিল না। আমার নীতি হল, আমার যা দরকার নেই কিংবা ভাল লাগে না, তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। সবকিছু জানতেই হবে কেন? পৃথিবীর সবকিছু জেনেটেনে ‘সুখে আছে যারা, সুখে থাক তারা।’


বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। দেখলাম, প্রিলি আর রিটেনের জন্য হাতে সময় আছে মাত্র ৪-৫ মাস। (সময় পেয়েছিলাম এরও কম।) প্রস্তুতি শুরু করার পর আমার প্রথম অনুভূতিঃ সবাই সবকিছু পারে, আমি কিছুই পারি না। অনেকেই দেখলাম বিসিএস নিয়ে অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি শেষ করে এখন পোস্টডক্টরেটে আছে। কোচিংয়ে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর ক্লাসে এক স্যার আমাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম কী? (পরে জেনেছি, কথাটা হবে, বিদেশমন্ত্রী) যে ছেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম জানে বলে খুশিতে বাকবাকুম করতে করতে একধরণের আত্মশ্লাঘাবোধ করে, তার পক্ষে এটা জানার কথা না এবং এ না-জানা নিয়ে তার মধ্যে কোন অপরাধবোধ কাজ করার প্রশ্নই আসে না! পারলাম না। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি হাহাহিহি শুরু হয়ে গেছে। তখন বুঝলাম, ‘এটা একটা সহজ প্রশ্ন ছিল।’ স্যার বললেন, "দেখি, এটা কেউ বলতে পারবেন?" সবাই হাত তুলল, উত্তরও দিল। সবাই-ই পারে! বুঝলাম, এই মুহূর্তে আমার চেহারাটা একটু লজ্জা-পাওয়া লজ্জা-পাওয়া টাইপ করে ফেলা উচিত। আমার বেহায়া চেহারাটাকে লাজুক লাজুকটাইপ করার চেষ্টা করছি, এমনসময় স্যার বললেন, "আপনার সম্পর্কে তো অনেক প্রশংসা শুনেছি। আপনি নাকি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ভাল স্টুডেন্ট। এটা পারেন না কেন? আপনার এজ কত?" ভাবলাম, কাহিনী কী? উনি কি আমার ঘটকালি করবেন নাকি? কিন্তু আমার মত বেকার ছেলেকে কে মেয়ে দেবে? (আমি আসলে বেকার ছিলাম না, নিজের কোচিং সেন্টার ছিল অন্যান্য ব্যবসাও ছিল; প্রচুর টাকাপয়সা ইনকাম করতাম। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষিত ছেলেরা চাকরি না করলে সবাই ভাবে, বেকার।) এসব ভাবতে ভাবতে আমার এজটা বললাম। রিপ্লাই শুনলাম, "ও আচ্ছা! আপনার তো এখনো এজ আছে। অন্তত ৩-৪ বার বিসিএস দিতে পারবেন। চেষ্টা করে যান। প্রথমবারে হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নাই, ২-৩ বার চেষ্টা করলে হলেও হতে পারে। আপনার বেসিক দুর্বল।" স্যারকে কিছুই বললাম না। কিন্তু মেজাজ খুব খারাপ হল। উনার প্রতি সমস্ত আস্থা আর সম্মানবোধ চলে গিয়েছিল। উনাকে আমার মনে হয়েছিল একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ। যে মানুষ আমাকে না চিনেই প্রথম দেখায় এমন কনফিডেন্টলি ফাউল একটা অ্যাসেসমেন্ট করতে পারে, তার ক্লাস করার তো প্রশ্নই আসে না, সে উনি যত ভাল ক্লাসই নিন না কেন! আমি কিছু পারি না, এটা তো আমি জানিই! এজন্যই তো কোচিংয়ে আসা। পারলে কি আসতাম নাকি? আমি একটা গাধা, এটা শোনার জন্য এত কষ্ট করে, সময় নষ্ট করে, গাড়ি ভাড়া দিয়ে বাসা থেকে কোচিংয়ে এসেছি নাকি? এটা শুনতে তো আর এতদূর আসতে হয় না। বাসায় বসে থাকলে মা দিনে অন্তত ১০বার একথা বলে! তখনই ঠিক করে ফেললাম, ব্যাটার ক্লাস আর কোনদিনও করব না। করিওনি।


পরে জানলাম, উনি অংক-ইংরেজি-বাংলা-বিজ্ঞানে অতিদুর্বল সাধারণ জ্ঞানে মহাপণ্ডিত ৫বার বিসিএস'য়ে ব্যর্থ একজন বিশিষ্ট বিসিএস বিশেষজ্ঞ। শুধু নিজেরটা ছাড়া পৃথিবীর সকল মানুষের ব্যর্থতার কারণগুলি তিনি খুঁজে দিতে পারেন। উনি জানতেন, সুশান্ত সাধারণ জ্ঞানের কিছুই পারে না। কিন্তু উনি এটা জানতেন না, সুশান্ত বাংলা-ইংরেজি-অংক-বিজ্ঞান ওসব বিষয়ে অনার্স মাস্টার্স করা যেকোনো স্টুডেন্টের চাইতে ভাল না পারলেও কোন অংশেই কম পারে না। উনি এটাও জানতেন না, শুধু সাধারণ জ্ঞানে তোতাপাখি হয়ে বিভিন্ন খাঁচায় বসে বসে মনভোলানো নানাঢঙে ডাক দেয়া যায়, কিছু হাততালিও জুটে যায়, কিন্তু বিসিএস ক্যাডার হওয়া যায় না। ক্লিনটনের ওয়াইফের বান্ধবীর পোষা কুকুরের নামও আপনার মুখস্থ, কিন্তু আমার নানার একটা কালো কুকুর ছিল’কে ইংলিশে লিখেন, My grandfather was a black dog……… কোনো কাজ হবে না। সত্যি বলছি, কোনো কাজই হবে না।


কোচিংয়ে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর প্রথম মডেল টেস্টে পেলাম ১০০'র মধ্যে ১৭! বলাই বাহুল্য, আমার মার্কসটাই ছিল সর্বনিম্ন। সেকেন্ড লোয়েস্ট মার্কসটা ছিল ৩৮; আমার প্রাপ্ত মার্কসের দ্বিগুণের চেয়েও ৪ বেশি! বুঝুন আমার অবস্থাটা! বাকিরা আমার অনেকআগে শুরু করেছে, আমি তো বিসিএস কথা জীবনেও শুনি নাই, আমি তো মাত্র শুরু করলাম----নিজেকে খুশি করার জন্য এসব কথা ভাবতেই পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। ভাবলাম, ঠিক আছে, আমি না হয় কিছু পারি না, সেটা তো আর আমার দোষ না। কিন্তু আমি যদি সে দুর্বলতাকে জয় করার জন্য কিছু না করি, হাতপা গুটিয়ে বসে থাকি, সেটা তো নিশ্চয়ই আমার দোষ! প্রচণ্ড পরিশ্রম করে পড়াশোনা করতে শুরু করলাম একেবারে জিরো থেকে। কে কী পারে সেটা ভেবে মন খারাপ না করে দুটো ব্যাপার মাথায় রেখে কাজ করতে লাগলাম। এক। সবাই যা পারে, সেটা পারাটা আদৌ কতটুকু দরকার। অন্ধের মত না পড়ে একটু বুঝেশুনে পড়তে শুরু করলাম। সবাই যা যা পড়ে, আমাকেও তা-ই তা-ই পড়তে হবে, এটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম। দুই। সাধারণ জ্ঞানে ভাল কারোর সাথে নিজেকে তুলনা না করে নিজের সাথেই নিজেকে তুলনা করা শুরু করলাম। গতকালকের সুশান্তের চাইতে আজকের সুশান্ত কতটা বেশি কিংবা কম পারে, শুধু সেটা নিয়েই ভাবতাম। আমার কম্পিটিশন হতো আমার নিজের সাথেই। অন্যকাউকে না, ‘আজকের আমি’ ‘আগেরদিনের আমি’কে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। কাজটা প্রতিদিনই করতাম। যারা ভাল পারে, তারা তো আর রাতারাতি এত ভাল পারে না। অনেক পরিশ্রম আর সাধনার পর এ দক্ষতা অর্জন করা যায়। যে স্টুডেন্টা অংকে ২০ পায়, সে যদি কখনো অংকে ২৪ পেয়ে যায়, তবে সে কিন্তু সাকসেসফুল। জানি, ৩৩ পেলে পাস, সে ফেল করেছে; তবুও আমি বলব, সে কিন্তু সফল। সে তো নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে। এভাবে করে একদিন সে ১০০'তে ১০০-ই পাবে! এরজন্য ওকে বুঝেশুনে প্রচুর প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে এবং এটাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। মজার ব্যাপার হল, জেতাটা একটা অভ্যাস। যে একটা চাকরি পেয়ে যায়, সে চাকরি পেতেই থাকে। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, হারাটাও কিন্তু একটা অভ্যাস। ভাল কথা, যারা কোচিং করছেন, কোচিংয়ে মার্কস কমটম পেলে মন খারাপ করবেন না। অনেকেই মেয়েদের কাছে হিরো হওয়ার জন্য আগে থেকে প্রশ্ন যোগাড় করে ‘পরীক্ষা’ দেয়। কোচিংয়ের প্রশ্ন যোগাড় করা তো কোন ব্যাপার না। এইরকম অনেক বান্দাকে আমি সেইরকমভাবে ধরা খেতে দেখেছি।


যে ছেলে কোনদিনও ঠিকভাবে বিসিএস'য়ের নামও শোনেনি, যে ছেলে জীবনেও কোন চাকরির পরীক্ষাই দেয়নি, সে ছেলে যদি বিসিএস পরীক্ষায় প্রথমবারেই ফার্স্ট হতে পারে, তবে আপনি কেন পারবেন না? ফার্স্ট হওয়াটা ভাগ্যে জুটুক আর না-ই বা জুটুক, মনপ্রাণ বাজি রেখে চেষ্টা করলে অন্তত চাকরিটা তো জুটবেই। ভাবছেন, খুব হেসেখেলে ফার্স্ট হয়ে গেছি? কিছুতেই না! এর জন্য অনেকরাত না ঘুমিয়ে কাটাতে হয়েছে। অনেক ছোট ছোট সুখকে গুডবাই বলে দিতে হয়েছে। মুখ বন্ধ রেখে মানুষের বড় বড় কথা হজম করে পড়াশোনা করতে হয়েছে।


আমি বিশ্বাস করি, আপনারাও পারবেন। যারা চাকরি পায়, ওরা আপনাদের চাইতে কোনোভাবেই বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন নয়। নিজের উপর আস্থা রাখুন, নিজেকে সম্মান করুন, আপনার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করুন। বাকিটা সৃষ্টিকর্তার হাতে!


গুড লাক!

৮ মে

একটি সত্যি ঘটনা শেয়ার করছি।


একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের একটা মেয়ে। এসএসসি’তে ৩.৮৮, মানে মাঝারি ধরণের রেজাল্ট। বাড়ির কাছাকাছি একটা মোটামুটি মানের থানার কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। কাছাকাছি মানে কিন্তু বাড়ি থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে। কোন যানবাহন নেই, হেঁটে যেতে হয়; বৃষ্টির সময় হাঁটুকাদার মধ্য দিয়ে। ওর অনেক ক্লাসমেটই ছোটবেলা থেকে ঠিকমতো টিচার পেয়েছে, কোচিংয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, সচেতন বাবা-মা’র সন্তান বলে পড়াশোনা কীভাবে করতে হয় সেটাও জানতে পেরেছে আগে থেকেই। মেয়েটা এতকিছু কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। কখনো কারোর কাছে প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য কিংবা সুযোগ কোনটাই তার ছিল না। একদিন কলেজের ইংরেজি শিক্ষক মেয়েটাকে বললেন, “তুমি আমার ব্যাচে আস।” মেয়েটা সাথে সাথেই বলল, “না স্যার! আপনার ব্যাচে যারা পড়ে, ওরা ইংরেজিতে অনেক ভাল। আমি কিছুই পারি না স্যার। আমি যাবো না।” স্যার জোর দিয়ে বললেন, “তুমি আস কালকে সকালে। বাকিটা পরে দেখা যাবে।” মেয়েটা পরেরদিন অনেক সংকোচ নিয়ে কোচিংয়ে গেল। একে তো গ্রাম্য মেয়ে, ঠিকমতো কথাও বলতে জানে না, তার উপর ইংরেজিতে অতি দুর্বল। ও গিয়ে দেখল কোচিংয়ের স্টুডেন্ট প্রায় ৩০ জন; সবাই ওর চাইতে অনেক ভাল ইংরেজি পারে। ও নিয়মিত যেতে থাকল। ও লজ্জায় কথাও বলতো না। যেত, এককোনায় চুপচাপ বসে বসে ক্লাস করত, আর ছুটি হলে কলেজে যেত।


একদিনের ঘটনা। ও ক্লাসে একটা ইংরেজি শব্দ ভুল উচ্চারণ করল। এতে তার এক ক্লাসমেট এত জোরে হাসল যা তার এখনো মাথায় বাজে। সেদিন ও এতই কষ্ট পেয়েছিল যে কোচিং শেষে আর কলেজে যায়নি, বাড়িতে এসে রুমের দরোজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ কাঁদল। সেদিনই ও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যে করেই হোক, ও ইংরেজি শিখবেই! প্রচণ্ড ইচ্ছেশক্তি আর পরিশ্রম করে সে পড়াশোনা করতে শুরু করল। ওর ইংরেজির শিক্ষক ওকে সবসময়ই উৎসাহ দিতেন, আর সাহায্য করতেন। ওর একটাই ইচ্ছে ছিল, যে করেই হোক, ও ওর ক্লাসমেটদের চাইতে ১ মার্কস হলেও বেশি পাবে! সে জীবন বাজি রেখে চেষ্টা করত। এভাবে করে ক্রমাগত চেষ্টায় ও ওদের কলেজে একটা টার্ম পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে গেল। এবং এরপর থেকে প্রতিবারই ফার্স্ট হতো। যে মেয়ে একটা সময়ে ইংরেজি শব্দ উচ্চারণও করতে পারত না, একেবারে সহজ গ্রামারও বুঝত না, ভোকাবুলারির অবস্থা ছিল শূন্যের কোঠায়, সে মেয়েটিই এইচএসসি’তে ইংরেজিতে এ+ পেল; ওর মার্কস ছিল ওর কলেজে সর্বোচ্চ। ওর জেদ ছিল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সেই ইংরেজি’তেই অনার্স-মাস্টার্স করবে। এবং পরবর্তীতে সেটাই করল।


আরেকটা ঘটনা ওর জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর রেজাল্ট বের হওয়ার আগে ও একটা অ্যাডমিশন টেস্ট কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিল। ক্লাসে তেমন কোন কথা বলতো না। স্যাররা যা জিজ্ঞেস করতেন, শুধু সেটারই উত্তর দিত। একদিন ক্লাসে এক স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাবা কী করেন?” ও গর্বের সাথে উত্তর দিল, “কৃষিকাজ করেন।” সেই স্যার তখন তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞার সাথে জিজ্ঞেস করলেন, “মানে কৃষক?” মেয়েটা বলল, “জ্বি স্যার।” “তাহলে উনি তো নিশ্চয়ই পড়াশোনা জানেন না। তা, তোমাকে বাড়িতে কে পড়ায়?” এসব শুনে ওর ক্লাসমেটরা হাসাহাসি করছিল। অনেক কষ্টে কান্না চেপে “স্যার, আমি নিজেই পড়ি, আমার বড় ভাই সবসময়ই আমাকে উৎসাহ দেন।” এইটুকু বলেই এইটুকুন মেয়েটা বসে পড়ল। অ্যাডমিশন টেস্টের রেজাল্টের পর কোচিং থেকে ওকে ফোন করেছিল ছবি তোলার জন্য। ওদের ব্যাচ থেকে একমাত্র ও-ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল। কোচিংয়ের লিফলেটে ওর দরিদ্র নিরক্ষর কৃষক বাবার সাথে ওর ছবি ছাপা হয়েছিল। সেদিন ব্যাচে ওর এক ফ্রেন্ড ওর বাবার পরিচয় দেয়ার জন্য ওকে গাধী বলে বকাঝকা করেছিল, এবং বলেছিল, এই পরিচয়টা ‘ট্যাক্টফুলি’ এড়িয়ে গেলেই ভাল হয়। আর সে মেয়েই এখন ওর কৃষক বাবা আর ওর গ্রাম্য যৌথ পরিবার নিয়ে সবাইকে মাথা উঁচু করে গর্বের সাথে বলতে পারে। সেই ছোট্টো মেয়েটা ওর অসাধারণ সুন্দর গ্রাম্য পরিবার নিয়ে সারাজীবনই গর্ব করে যাবে।


যে দেশে কৃষকের সন্তান প্রাপ্য সম্মান পায় না, যে দেশে বিয়ের সময় উচ্চ বংশজাত নিম্ন অবস্থান আর রুচির পাত্রপাত্রীরাও প্রাধান্য পায়, যে দেশে ‘খারাপ’ স্কুলকলেজ থেকে পাসকরা স্টুডেন্টদেরকে ‘খারাপ’ স্টুডেন্ট বলে ধরে নেয়া হয়, যে দেশে বাইরের চাকচিক্য দিয়ে এখনো মানুষ বিচার করা হয়, যে দেশে ফালতু বাহ্যিক স্মার্টনেস দেখানো ফাউল ছেলেপেলেদের মূল্যায়ন করা হয়, যে দেশে বড়লোকের সন্তানই শুধু বড় চেয়ারটা পায়, যে দেশে মেরুদণ্ডহীন ছেলেরা বসে থাকে বিয়ের পর মেয়ের বাবার টাকায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশায়, আমি বিশ্বাস করি, সে দেশ আর যা-ই হোক, বেশিদূর যেতে পারে না। এটা সত্যিই খুব লজ্জার। আমাদের দেশের এই করুণ দুর্দশার জন্য আমাদের মানসিকতাই দায়ী।


আমি নিজেও চট্টগ্রামের সবচাইতে ‘বাজে’ স্কুলগুলোর একটি চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। স্কুলটাকে সবাই অবজ্ঞা করে ‘বালতি স্কুল’ বলে ডাকে। আমাকে অনেক তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করতে হয়েছে। টুডে আই অ্যাম প্রাউড অব মাই ‘বালতি স্কুল’!!


বড় বড় কথাবলা অল্পবয়েসি ছেলেমেয়েরা! এই বড় ভাইয়ার কথা বিশ্বাস কর, দিন সারাজীবন এরকম থাকবে না। যেদিন তোমাদের সমাজের কাছে মাথা নিচু করে চলতে হবে, সেদিন তুমি কোথায় পালাবে? সময় থাকতে এখুনি নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য চেষ্টা কর। যারা তোমাকে তোয়াজ করে, তারা কোন স্বার্থে এ কাজটা করে, সেটা একটু ভেবে দেখ। জীবনটা সবসময়ই এভাবে করে যাবে না। তোমার মা-বাবা’কে সমাজের কাছে সম্মানিত করার চেষ্টা কর। পৃথিবীর কাছে নোবডি হয়ে বেঁচে থাকাটা যে কতটা গ্লানির আর কষ্টের, সেটা আমি খুব ভাল করে জানি। মানুষকে সম্মান কর, বিনীত হতে শেখো, আর প্রচুর পরিশ্রম করার অভ্যেস গড়ে তোলো। জীবনটাকে এখন চাবুকপেটা করার সময়, উপভোগ করার নয়। তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।

https://www.facebook.com/notes/sushanta-paul/%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8-%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%AE/10152711958337038?pnref=story

মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০১৫

বোর্ড পরীক্ষার সার্টিফিকেট হারিয়ে গেলে আপনার করনীয়

একটি ছাত্রের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সার্টিফিকেট আর তা হারিয়ে গেলে ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান অনেকেই। কী করবেন, কিভাবে সার্টিফিকেট ফিরে পাবেন তা বুঝতে পারেন না। সার্টিফিকেট বা এ ধরনের মূল্যবান শিক্ষাসংক্রান্ত কাগজপত্র হারালে বা নষ্ট হয়ে গেলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।
প্রথমে যা করবেনঃ
সার্টিফিকেট, নম্বরপত্র বা প্রবেশপত্র হারিয়ে গেলে দেরি না করে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এর জন্য প্রথমে আপনার এলাকার নিকটবর্তী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হবে।
জিডির একটি কপি অবশ্যই নিজের কাছে রাখতে হবে। এরপর যেকোনো একটি দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। বিজ্ঞপ্তিতে নাম, শাখা, পরীক্ষার কেন্দ্র, রোল নম্বর, পাসের সাল, বোর্ডের নাম এবং কিভাবে আপনি সাটিফিকেট, নম্বরপত্র অথবা প্রবেশপত্র হারিয়েছেন তা সংক্ষেপে উল্লেখ করতে হবে।
থানায় জিডি ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আপনাকে যেতে হবে যে বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিয়েছেন সেই শিক্ষা বোর্ডে। শিক্ষাবোর্ডের ‘তথ্যসংগ্রহ কেন্দ্র’ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহের পর নির্ভুলভাবে পূরণ করতে হবে। এরপর নির্ধারিত ফি সোনালী ব্যাংকের ডিমান্ড ড্রাফটের মাধ্যমে বোর্ডের সচিব বরাবর জমা দিতে হবে। টাকা জমা হওয়ার পর আবেদন কার্যকর হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে মূল ব্যাংক ড্রাফট, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির কাটিং ও থানার জিডির কপি জমা দিতে হবে।
আবেদনপত্রে যা পূরণ করতে হবেঃ
আবেদনপত্র পূরণের ক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে আপনি কোন পরীক্ষার (মাধ্যমিক না উচ্চমাধ্যমিক) কী হারিয়েছেন এবং কী কারণে আবেদন করছেন। আবেদনপত্রের বিভিন্ন অংশে ইংরেজি বড় অক্ষরে এবং বাংলায় স্পষ্ট অক্ষরে পূর্ণ নাম, মাতার নাম, পিতার নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম, রোল নম্বর, পাশের বিভাগ/জিপিএ, শাখা, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, শিক্ষাবর্ষ এবং জন্মতারিখ সহ বিভিন্ন তথ্য লিখতে হবে।
পরবর্তী অংশে জাতীয়তা, বিজ্ঞপ্তি যে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেটির নাম ও তারিখ এবং সোনালী ব্যাংকের যে শাখায় ব্যাংক ড্রাফট করেছেন সে শাখার নাম, ড্রাফট নম্বর ও তারিখ উল্লেখ করতে হবে। আবেদনপত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সুপারিশের প্রয়োজন হবে। এতে তার দস্তখত ও নামসহ সিলমোহর থাকতে হবে। আর প্রাইভেট প্রার্থীদের আবেদনপত্র অবশ্যই গেজেটেড কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও নামসহ সিলমোহর থাকতে হবে।
নষ্ট হয়ে যাওয়া সনদপত্র/নম্বরপত্র/একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টের অংশবিশেষ থাকলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে না বা থানায় জিডি করতে হবে না। এ ক্ষেত্রে আবেদনপত্রের সঙ্গে ওই অংশবিশেষ জমা দিতে হবে। তবে সনদে ও নম্বরপত্রের অংশবিশেষে নাম, রোল নম্বর, কেন্দ্র, পাশের বিভাগ ও সন, জন্ম তারিখ ও পরীক্ষার নাম না থাকলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর বিদেশি নাগরিককে ব্যাংক ড্রাফটসহ নিজ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।
কত টাকা লাগবেঃ
সাময়িক সনদ, নম্বরপত্র, প্রবেশপত্র ফি (জরুরি ফিসহ) ১৩০ টাকা। এ ছাড়া ত্রি-নকলের জন্য ১৫০ টাকা এবং চৌ-নকলের জন্য ২৫০ টাকা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা দিতে হয়।

জাতীয় পরিচয়পত্র (ন্যাশনাল আইডি কার্ড) এর ছবি পরিবর্তন তথ্য পরিবর্তন ও নতুন ভোটার হোন অনলাইনে

বাংলাদেশে যত জাতীয় পরিচয়পত্র (ন্যাশনাল আইডি কার্ড) আছে ৯৯% ছবি অস্পষ্ট ও ২০% জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য ভুল রয়েছে, আমি আজ আপনাদের দেখাবো কিভাবে ঘরে বসেই অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডি কার্ডের বিস্তারিত ডিটেইলস দেখতে পারবেন, ছবি পরিবর্তন, ঠিকানা পরিবর্তন, ভুল সংশোধন ও তথ্য হালনাগাদ করতে পারবেন ও কিভাবে অনলাইনে নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন ফরম পূরণ করা যাবে ।
National ID Card Bangladeshএই পোস্টটি পড়ে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিস্তারিত দেখে নিন এবং ফেসবুকে শেয়ার করে বন্ধুদের অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্র ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ছবি পরিবর্তন তথ্য পরিবর্তন ও নতুন ভোটার হবার বিস্তারিত নিয়মকানুন জানিয়ে দেন ।

আজকে দেখাবো অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্রের কি কি পরিবর্তন আপনি নিজেই করতে পারবেন ?

বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৪

আমি কখনো হাল ছাড়ি না

মারিয়া শারাপোভা বিশ্বের অন্যতম আলোচিত টেনিস খেলোয়াড়। শারাপোভার জন্ম রাশিয়ায়, ১৯৮৭ সালের ১৯ এপ্রিল। এ যাবৎ তিনি টেনিসের পাঁচটি গ্র্যান্ড স্লাম জয় করেছেন। ২০০৭ সাল থেকে মারিয়া জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন।
১৭ বছর বয়সে আমি উইম্বলডন জয় করি। এর কয়েক বছরের মধ্যেই মারাত্মকভাবে কাঁধের ইনজুরিতে পড়ে আমার খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আমার সামনে অনেক কারণ ছিল, যার জন্য টেনিস খেলাই ছেড়ে দেওয়ার কথা তুলেছিল অনেকে। ইচ্ছা করলেই তখন খেলা ছেড়ে দিতে পারতাম, কিন্তু হাল না ছেড়ে আবার কোর্টে নামার সাহস করি।
সত্যিকার অর্থে, আমার বেড়ে ওঠা ছিল ছাই থেকে। আবর্জনা থেকে আমার পরিবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। আমার শিকড় কোথায়, সেটা আমি জানি। আমার শুরুর সেই কষ্টের দিনগুলো আমি কখনোই ভুলতে পারব না। আমার বাবা-মা দুজনেই বেলারুশ থেকে আসেন। আমি যখন মায়ের পেটে, তখন চেরনোবিল দুর্যোগ ঘটে। বাবা আর মায়ের কাজ চলে যায়। তাঁদের বাকি জীবনটা অনেক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গেছে। আমি তাঁদের মেয়ে। বাবা চার বছর বয়সে আমার হাতে টেনিস র্যাকেট তুলে দেন। বাবাই ছিলেন আমার প্রথম কোচ। স্কুলে পড়াশোনা আর বাড়ির কাজ শেষ করে প্রতিদিন টেনিস অনুশীলনে নামতাম।
আমি কোনো কিছু ধরলে তা ছাড়ি না। আমার বিখ্যাত কোনো বন্ধু ছিল না, যার মাধ্যমে আমি খ্যাতি অর্জন করতে পারি। কিংবা আমি ফ্যাশন মডেল নই, যাকে কোনো লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন বিখ্যাত করেছে। মূল কথা হচ্ছে, টেনিসই আমাকে সব দিয়েছে। ইনজুরিতে থাকার সময় যখন ম্যাগাজিন আর পত্রিকায় আমার ছবি দেখতাম, তখন ঠিক থাকতে পারতাম না। হাসপাতালে বসে কোর্টে দৌড়ানোর শব্দ পেতাম। আর দৌড়াব বলেই টেনিস কোর্টে ফিরে আসি।
আমি সব সময় মাঠে থাকতে চাই। প্রতিদিন। জয়-পরাজয় নিয়ে ভাবি না। মাঠে থাকাই সব। খেলা শেষে ঘেমে একাকার হয়ে বাড়ি ফিরতে চাই।
আমার বেড়ে ওঠা ছিল রাশিয়ার সোচি শহরে। যুক্তরাষ্ট্রে সবাইকে সোচি নামের বানান করে বলতে হতো। কেউ জানত না সোচি মানচিত্রের কোথায়। এখন আমার জন্য অনেকেই মানচিত্রে সোচি শহরকে চেনে। এটা অনেক আনন্দের। আমি যখন রাশিয়ার পতাকা নিয়ে কোথাও দাঁড়াই, তখন আমার চেয়ে গর্বিত আর কে হয় বলুন?
খেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক টেনিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে এসেছিলাম। যার জন্য মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই বছর দেখা হয়নি। তখন আমাদের মুঠোফোন ছিল না, কোনো ই-মেইলও ছিল না। একটা কলম আর এক টুকরা কাগজই ছিল আমার সব। মাকে চিঠি লিখতাম। চিঠি যখন মায়ের কাছে যেত, তখন আমার যে অনুভূতি হতো, তা এখনো শিহরিত করে।
টেনিস খেলার একাডেমিতে অন্য মেয়েরা আমাকে নিয়ে হাসত। বেশি ছোট ছিলাম বলে র্যাগিংয়ের শিকার হতাম। আমাকে টিজ করা হতো। তখন আমি হতাশ হয়ে একা একা কাঁদতাম, কিন্তু আমার লক্ষ্য আমি জানতাম। রেগে দেশে ফিরে গেলে আমি হয়তো আজকের আমি হতাম না। সব সময় আশাবাদী হয়ে থাকলে বিপদে পড়লেও নিজেকে নিজে উদ্ধার করা যায়। কষ্ট করে লেগে থাকতে হয় স্বপ্নের পেছনে।
২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে উইম্বলডন জেতা ছিল আমার জন্য বিস্ময়। এটা স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। কখনোই চিন্তা করিনি মাত্র দুই সপ্তাহে পৃথিবীর সেরা সব টেনিস খেলোয়াড়কে হারিয়ে দেব! ফাইনালে আমি সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে দিই। আমি কতটা দুর্ধর্ষ টেনিস খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিলাম, তা ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। কোনো দিকে মন না দিয়ে টেনিস বলেই আঘাতের পর আঘাত করে গিয়েছি। ফলে ফাইনালে আমার হাতেই ছিল সেরার পদকটি।
বেঁচে থাকার জন্য আমি টেনিস বলকে আঘাত করি, পরিশ্রম করি। আমি সব সময় সবার কাছ থেকে শেখার আগ্রহ নিয়ে বসে থাকি। বাবা আর মায়ের কাছ থেকেই আমি কৌতূহলী হয়ে ওঠার নেশাটি পেয়েছি। আমার কাছে সবচেয়ে বড় আর গুরুত্বের বিষয় হলো, প্রথমে ভালো মানুষ হওয়া, তারপর পেশাদার ক্রীড়াবিদ হতে হবে। এটা সত্যি অনন্য এক চ্যালেঞ্জ।
বেঁচে থাকার জন্য বন্ধুর বিকল্প নেই। আমি সুযোগ পেলেই বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যাই, গান গাই। টেনিস নিয়ে পড়ে থাকলেও পরিবারকে সময় দিই। যখন খুব হতাশায় ভুগি, তখন নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিই। নেইলপলিশ হাতে গ্র্যান্ড স্লামের ট্রফিগুলো তোলার স্মৃতি বারবার মনে করে নিজেকে সাহস দিই। আর হতাশার মাত্রা চরমে উঠলে গলা ছেড়ে গান গাই। প্রতিদিন সকালে আমি গান শুনে বাড়ি থেকে বের হই। আমার দুনিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো মায়ের হাতের রান্না। মায়ের হাতের বৈচিত্র্যময় রান্নার জন্য বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে আমার। আমি সময় পেলেই বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাই। একই বই কয়েকবার পড়ার বাতিক আছে আমার।
আমাকে কেউ কেউ ‘সুগারপোভা’ নামে ডাকে। অনেক ছোটবেলা থেকে আমি চকলেটের ভক্ত। আমার দাঁতে সব সময় চিনি লেগে থাকত। আমি চাইতাম বড় হয়ে আমি চকলেটের দোকান দেব। বড় হয়ে ব্যবসায়ী হব। সত্যি সত্যি টেনিস খেলার ক্যারিয়ার শেষ করে ব্যবসা করতে নামব।
মানুষের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা সে নিজেই। নিজেকে সাফল্যের চূড়ায় দেখতে চাইলে মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। যখন যা করো, তা-ই উপভোগ করো। বাড়িতে থাকলে টিভি দেখো, সিনেমা উপভোগ করো। হাসো। কিন্তু যখন কাজ করবে, তখন তাকে উপভোগ করো। নিজের প্রতিভা আর বুদ্ধি দিয়ে কঠিন সব কাজকে আয়ত্তে আনাই সফল ব্যক্তিদের কাজ। নিজের জীবনকে নিজেকেই আকর্ষণীয় করে তুলতে হয়। গণ্ডির মধ্যে না থেকে মাঝেমধ্যে পাগলামি করো। পাগলামি করা শেখো। সামান্য কিছুতেই হাসতে শেখো। হাসিই সবচেয়ে বড় ওষুধ। ঝুঁকি নিতে শেখো। দাঁতে পোকা ধরার ঝুঁকি থাকলেও মাঝেমধ্যে চকলেট খাও। নিজেকে নিয়ে খুশি থাকো!
কিশোর বয়সে যারা টেনিস খেলতে চায়, তাদের জন্য আমার পরামর্শ, লেগে থাকতে হবে। পড়তে হবে, জানতে হবে, খেলতে হবে। সবকিছুর জন্য চাই কঠিন অনুশীলন। ব্যর্থ হলেও লেগে থাকতেই হবে। সফল হলেও লেগে থাকতে হবে।
তথ্যসূত্র: টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন
জাহিদ হোসাইন খান
http://www.prothom-alo.com/we-are/article/360427/%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A6%96%E0%A6%A8%E0%A7%8B-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B2-%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%BF-%E0%A6%A8%E0%A6%BE

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৪

বেসরকারিভাবে হেলিকপ্টার ভাড়া

যানজটের ভোগান্তি এড়াতে ও অন্যদিকে মূল্যবান সময়ও বাচাতে পারেন হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। 
তবে যানজটের এই ভোগান্তি বেশি পোহাতে হয় এ দেশে ব্যবসার কাজে আসা বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের। সে কারণেই এ দেশে আসা ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন ঢাকার বাইরে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হেলিকপ্টারকে। ঢাকা থেকে দূরবর্তী চট্টগ্রাম, সিলেটের মতো শহরের পাশাপাশি ঢাকার কাছাকাছি নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর কিংবা ময়মনসিংহে কারখানা পরিদর্শন করতে বিদেশি ব্যবসায়ীরা এখন হরহামেশাই হেলিকপ্টার ব্যবহার করছেন।
আর রপ্তানিকারক তথা এ দেশের ব্যবসায়ীরাও বিদেশি ক্রেতাদের সন্তুষ্টির জন্য অনেক সময়ই শরণাপন্ন হচ্ছেন বেসরকারি হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর। জরুরি প্রয়োজনে তাঁরা নিজেরাও হেলিকপ্টারে যাতায়াত করছেন। এসব কারণে দেশে হেলিকপ্টারে যাতায়াতের চাহিদা বাড়ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দেওয়া তথ্য অুনযায়ী, তিন বছর আগেও দেশে বেসরকারি পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার ভাড়া দেওয়ার কাজ করত মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান। তবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গত তিন বছরে নতুন করে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে হেলিকপ্টার ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা শুরু করেছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো স্কয়ার এয়ার লিমিটেড, সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস, মেঘনা এভিয়েশন, আরঅ্যান্ডআর এভিয়েশন, ইমপ্রেস এভিয়েশন, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস এবং বিআরবি এয়ার লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় বর্তমানে হেলিকপ্টার আছে ১৫টি। চার বছর আগে তাদের সম্বল ছিল মাত্র পাঁচটি হেলিকপ্টার।
হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের যেকোনো স্থানে হেলিকপ্টারে ভ্রমণের জন্য প্রতি ঘণ্টায় (ফ্লাইং আওয়ার) ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ পড়ে। কোথাও যাত্রাবিরতি (গ্রাউন্ড ওয়েটিং) করলে প্রতি ঘণ্টায় মাশুল দিতে হয় পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। এসব মাশুলের সঙ্গে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন করও (মূসক) আরোপ করা হয়।
১৯৯৯ সালে দেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার সেবা চালু করে সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস। এ খাতে সর্বশেষ সংযোজন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে যাত্রা শুরু করা ইমপ্রেস এভিয়েশন।
ইমপ্রেস এভিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এখনো হেলিকপ্টার ব্যবসায়িকভাবে ভাড়া দেওয়ার চেয়ে নিজেদের প্রয়োজনেই বেশি ব্যবহার করছি। তবে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সেবাভিত্তিক শিল্প হিসেবে হেলিকপ্টার সেবা গড়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।’ গণমাধ্যমের জরুরি সংবাদ সংগ্রহ, নাটক কিংবা সিনেমার শুটিং, রাজনৈতিক নেতাদের সফরের কাজেও এখন হেলিকপ্টারের ব্যবহার বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তাদের যাত্রীর একটি বড় অংশই এ দেশে আসা তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা।
বিষয়টি স্বীকার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যানজটের কারণে সড়কপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা একটু দূরের কোনো শহরে যেতে এখন অনেক ক্ষেত্রে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতেই অনেক সময় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা লাগে। আবার অনেক জায়গায় রাস্তার অবস্থাও খুব খারাপ। এত সময় ব্যয় করে খারাপ রাস্তা দিয়ে একজন বিদেশি কেন ওই সব জায়গায় যাবেন? সময় বাঁচাতে তাই অনেক সময় বাধ্য হয়েই আমাদের হেলিকপ্টার ভাড়া করতে হয়।’
একটি হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের অভ্যন্তরে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ব্যবসা ও কলকারখানার সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এসব শিল্পগোষ্ঠীর মালিকেরা তাঁদের মালিকানাধীন শিল্পগুলো দেখভাল করার জন্য ও জরুরি ব্যবসায়িক প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন।
স্কয়ার এয়ারের পরিচালক (অপারেশনস) ও প্রধান পাইলট সৈয়দ সাখাওয়াত কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্কয়ার হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীদের আনার জন্যই আমরা ২০১০ সালে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে হেলিকপ্টার সার্ভিসটির শুরু করি। তবে এই সেবা ছাড়াও দেশের যেকোনো স্থানে যাত্রী পরিবহন করি আমরা। এর পাশাপাশি স্কয়ার গ্রুপের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।’ বর্তমানে স্কয়ারের মালিকানায় দুটি হেলিকপ্টার আছে বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেল, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, পাইলটসহ কারিগরি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বেতনসহ মাসে একটি হেলিকপ্টারের পেছনে অন্তত ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি হেলিকপ্টার রাখার জন্যও (হ্যাঙ্গার) অনেক বড় জায়গার প্রয়োজন হয়। প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই মূলত হেলিকপ্টারের পাইলট হিসেবে কাজ করেন। উচ্চ প্রশিক্ষিত হওয়ায় তাঁদের পারিশ্রমিকও বেশি।
পরিচালনার এই উচ্চ ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে গত ১২ বছরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হেলিকপ্টার ব্যবসাও গুটিয়ে নিয়েছে। ২০০০ সালে অ্যারো টেকনোলজিস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার সেবা চালু করেছিল। গ্রাহক আকৃষ্ট করতে না পেরে ২০০৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি সেবাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এ ছাড়া বেস্ট এয়ার ২০০২ সালে হেলিকপ্টার সেবা চালু করে কয়েক মাস পরেই বন্ধ করে দেয়। নিটোল গ্রুপের নিটোল এভিয়েশন সার্ভিস লিমিটেড বেশ আয়োজন করে ব্যবসা চালু করলেও এখন নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
অন্য চিত্রও আছে। ২০০৬ সালে চালু হওয়া বাংলা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস গ্রাহক না থাকায় মাঝে কয়েক বছর নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে এখন পুনরায় চালু হয়েছে, যাত্রীসেবাও দিচ্ছে।
হেলিকপ্টার ভাড়া নেওয়ার চাহিদা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে এই ব্যবসা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না মালিক ও পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো। তারা বলছেন, এখনো পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে মুনাফা করতে পারছেন না তাঁরা। সাতটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দু–একটি বাদে বেশির ভাগই মাসে ব্রেক ইভেনে (না লাভ না লোকসান অবস্থা) যেতে পারছে না। বড় অঙ্কের বিনিয়োগের কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক হতে আরও সময় লাগবে বলে তাঁরা মনে করেন।
ব্যবহার
স্থানীয় রপ্তানিকারক–ব্যবসায়ীরা নিজেদের জরুরি প্রয়োজনে ও বিদেশি ক্রেতাদের সন্তুষ্টির জন্যও অনেক সময় হেলিকপ্টার ভাড়া করেন
গণমাধ্যমের জরুরি সংবাদ সংগ্রহ, নাটক কিংবা সিনেমার শুটিং, রাজনৈতিক নেতাদের সফরের কাজেও হেলিকপ্টার ভাড়া হয়
হেলিকপ্টারের মালিকেরা নিজেদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনেও এটি ব্যবহার করে থাকেন
যাত্রা শুরু
১৯৯৯ সালে দেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার সেবা চালু করে সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস
সর্বশেষ সংযোজন
এ খাতে সর্বশেষ সংযোজন ২০১৪ সালের মার্চ মাসে যাত্রা শুরু করা ইমপ্রেস এভিয়েশন
ভাড়া
ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ১৫% ভ্যাট যোগ হয় 

source-http://www.prothom-alo.com/economy/article/359389/%E0%A6%B9%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%9B%E0%A7%87

মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৪

‘বাহ, লেখাপড়া না জেনেই এত বড় ব্যবসা সামলাচ্ছেন না জানি লেখাপড়া বেশী জানলে কি করতেন!’

 তৎকালীন লন্ডনের একটি চার্চে বেশ কড়া নিয়ম ছিলো। তারা সুশিক্ষিত না হলে কোনও পদেই চাকুরীর জন্য কাউকে নিয়োগ দিত না। এহেন অবস্থায় দারিদ্রের নিপীড়নের স্বীকার হয়ে ‘আলফ্রেড ডানহিল’ সেই চার্চে এলো কোনও রকমে কিছু করে খাবারের সুযোগের জন্যে। বুড়ো পাদ্রী ভীষণ দয়ালু আর ভাবলেন দরিদ্র এই লোকটিকে সাহায্য করা উনার নৈতিক দায়িত্ব। তিনি চার্চের নিয়মের বিরুদ্বে গিয়ে এই লোকটিকে সাফাই কর্মী পদে নিয়োগ দিলেন। ভাবলেন এই ক্ষুদ্র পদের জন্যে এতো শিক্ষার দরকার নেই। ডানহিলকে নিয়োগ দিলেও তিনি তাঁকে লেখাপড়া করে যাবার নির্দেশ দিলেন যাতে চার্চ পরবর্তীতে কোনও আপত্তি না করতে পারে।
‘আলফ্রেড ডানহিল’ এর বেশ চলে যাচ্ছিলো। এমন সময় হঠাত একদিন সেই বুড়ো পাদ্রী মারা গেলেন আর তার জায়গায় অভিষেক হলো এক নতুন তরুন পাদ্রীর। নতুন পাদ্রী কিছুদিন পরেই ‘আলফ্রেড ডানহিল’ – কে ডেকে কড়া ভাষায় নির্দেশ দিলেন, হয় আগামী ছয় মাসের মধ্যে তাঁকে শিক্ষা সনদ জমা করতে হবে নতুবা চাকরি থেকে বের হয়ে যেতে হবে।
‘আলফ্রেড ডানহিল’ এর বুঝতে বাকি থাকলো না এবার তার পাঠ চুকেছে। মন খারাপ করে কি করবে, কি ভাবে চলবে, এসব ভেবে ব্যস্ততম সড়কে (বন্ড ষ্ট্রীট) পায়চারী করছিলো। হঠাত তার সিগারেট খাবার প্রবল ইচ্ছা হলো। মনে হলো যেন মাথায় ধোঁয়া না ঢুকালে কিছুই ভেবে কুল করতে পারবে না। দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে এবার সিগারেটের খোঁজে ছুটল ‘আলফ্রেড ডানহিল’। সেই সড়কের শেষ প্রান্তে একটি ছোট গলির খুব ভিতরে গিয়ে সে একটি সিগারেটের দোকান খুঁজে পেলো। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে আবার সেই দুশ্চিন্তার শুরু। হঠাত তার মাথায় এলো এই যে এত বড় ব্যস্ততম সড়ক সেখানে একটাও সিগারেটের দোকান নেই। তার মত কত লোকের সিগারেট খেতে মন চাইলে কত দূর অবধি হেঁটে যেতে হয়। তাই এইখানেই একটা সিগারেটের দোকান দিতে পারলে কেমন হয়?
যে ভাবা সেই কাজ পরদিনই চাকরি ছেড়ে নিজের সমস্ত সঞ্চয়কে নিয়ে ছোট্ট, খুব ছোট্ট একটি সিগারেটের দোকান দিলো সেই ব্যস্ততম সড়ক- বন্ড স্ট্রীটে। অল্প কছুদিনের মধ্যেই অভাবনীয় সাড়া পেতে লাগলো ‘আলফ্রেড ডানহিল’ এর সিগারেটের দোকান। এবার সে ব্যবসাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলো, লক্ষ্য করলো তার দোকানের বেশ কিছু ক্রেতা আসেন সড়কের উল্টোপাশ থেকে। কিছুদিন পরেই ক্রেতাদের সুবিধা বিচার করে ‘আলফ্রেড ডানহিল’ সড়কের উল্টোপাশে আরেকটি দোকান খুলে বসলো। এভাবে সেই দুটি দোকান অল্প কিছুদিনের মধ্যেই চারটিতে পরিনত হলো এবং পরবর্তী তিন বছরে সেই চারটি দোকান ষোলোটিতে পরিনত হলো।
এবারে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি কার গল্প বলছিলাম। লাল সাদা প্যাকেটের সেই ডানহিল সিগারেটের গল্প। যাইহোক, এর পর ‘আলফ্রেড ডানহিল কোম্পানী’ হয়ে উঠলো ইংল্যান্ডের সব চেয়ে বড় তামাকের ব্যবসায়ী। সর্ব প্রথম মেশিন রোল সিগারেট এনে বাজারে হৈ চৈ ফেলে দিলেন এর পর পরই তিনি নিজের ব্র্যান্ড নিয়ে এলেন বাজারে - ‘ডানহিল’ সিগারেট। পাঁচ বছরে হয়ে গেলেন কোটিপতি। নিজের ফ্যাক্টরিতে তামাকের সাপ্লাই পর্যাপ্ত ও বাধাহীন রাখার জন্যে তিনি আমেরিকার বেশ কিছু তামাক চাষীর সাথে বার্ষিক আমদানী চুক্তি করলেন।
ক্রয় চুক্তি পাকাপাকি করার জন্যে ডানহিল আমেরিকা চলে গেলেন এবং তার ক্রয় চুক্তি অনুষ্ঠান হয়ে উঠলো বিশাল মিডিয়া সার্কাস। সেই অনুষ্ঠানে সেনেটর থেকে গভর্নর পর্যন্ত সবাই উপস্থিত ছিলেন। মজার ঘটনা হলো, সত্যি সত্যি ক্রয় চুক্তি নিষ্পন্ন হবার পর এলো স্বাক্ষর করার পালা। স্বাক্ষর এর স্থানে ডানহিল দিলো বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ। লেখাপড়া তো করেন নি তাই এছাড়া তার উপায় ছিলোনা। এতে গভর্নর তাঁকে ছোটো করার সুযোগ পেয়ে বললেন ‘বাহ, লেখাপড়া না জেনেই এত বড় ব্যবসা সামলাচ্ছেন না জানি লেখাপড়া বেশী জানলে কি করতেন!’
ডানহিল শুধু ছোট্ট উত্তর করলেন, ‘লেখাপড়া বেশী জানলে আমি চার্চের ফ্লোরই পরিষ্কার করতাম’।

collected from-https://www.facebook.com/groups/uddokta/permalink/768557863224322/